অসুস্থ হয়ে মানুষ চিকিৎসকের কাছে যান সুস্থ হওয়ার আশায়। চিকিৎসকের পরামর্শকে অধিকাংশ রোগীই চূড়ান্ত নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করেন। চিকিৎসক যখন বলেন—রক্ত পরীক্ষা করতে হবে, আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে হবে, এক্স-রে বা সিটি স্ক্যান করতে হবে, কিংবা একাধিক ব্যয়বহুল পরীক্ষা করাতে হবে—তখন রোগী সাধারণত প্রশ্ন করেন না, সত্যিই সবগুলো পরীক্ষা প্রয়োজন কি না? এই আস্থাকেই কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় একটি গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত—রোগীর প্রয়োজনের চেয়ে কমিশন বা আর্থিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী পাঠানো।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: সব চিকিৎসক অতিরিক্ত পরীক্ষা দেন বা কমিশন নেন—এমন দাবি সঠিক নয়। অসংখ্য চিকিৎসক পেশাগত নৈতিকতা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাই দিয়ে থাকেন।
বাংলাদেশের একটি গবেষণাভিত্তিক BMJ Open গবেষণায় বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে রোগী রেফারেলের বিনিময়ে কমিশন পাওয়ার চর্চার কথা উঠে এসেছে। গবেষণায় সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের বক্তব্যে এমন কমিশনের হার ৪০–৫০ শতাংশ পর্যন্ত হওয়ার অভিযোগও নথিভুক্ত হয়েছে।
রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা চিকিৎসাবিজ্ঞানের অপরিহার্য অংশ। রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা, ইউরিন পরীক্ষা, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, এন্ডোস্কপি, বায়োপসি—রোগের ধরন অনুযায়ী এসব পরীক্ষা জীবন রক্ষাকারী ভূমিকা রাখতে পারে।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন—
এ ধরনের পরিস্থিতিতে চিকিৎসার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার কথা রোগী; কিন্তু বাস্তবে রোগী পরিণত হতে পারেন একটি রাজস্বের উৎসে।
২০২২ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের একটি অঞ্চলে রোগী রেফারালের ক্ষেত্রে ২০–৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশনের অভিযোগ উঠে এসেছিল। সেখানে চিকিৎসক, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মধ্যে আর্থিক সম্পর্কের অভিযোগও তুলে ধরা হয়। বর্তমানে এটি এখন মহামারী আকারে উঠে এসেছে।
কমিশনের বোঝা শেষ পর্যন্ত কার ঘাড়ে?
একজন রোগী যখন কোনো পরীক্ষা করান, তিনি পরীক্ষার সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করেন। কিন্তু যদি সেই মূল্যের একটি অংশ কোনো রেফারাল কমিশন হিসেবে অন্য কারও কাছে যায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—এই অর্থের প্রকৃত উৎস কে?
উত্তর—শেষ পর্যন্ত রোগীই।
চিকিৎসকের স্বাধীনতা বনাম রোগীর অধিকার
একজন চিকিৎসককে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা দেওয়ার স্বাধীনতা অবশ্যই দিতে হবে। কারণ প্রতিটি রোগীর অবস্থা আলাদা এবং চিকিৎসকই রোগীর শারীরিক অবস্থা, ইতিহাস ও সম্ভাব্য রোগ বিবেচনা করে পরীক্ষা নির্ধারণ করেন।
কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিতাও থাকতে হবে।
প্রশ্ন হতে পারে—
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর রোগী জানার অধিকার রাখেন।
ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক ও ব্যবস্থাপকদের জবাবদিহিতার আওতা কঠোর হওয়া উচিত।
ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক ও ব্যবস্থাপনাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
যদি কোনো প্রতিষ্ঠান রোগী পাঠানোর বিনিময়ে চিকিৎসক, কর্মী বা মধ্যস্বত্বভোগীকে অর্থ প্রদান করে, তাহলে সেটি বন্ধ করার জন্য কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
কারণ একটি প্রতিষ্ঠান কমিশন দিলে আরেকটি প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে একই পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে। ফলে তৈরি হয় একটি ‘কমিশন প্রতিযোগিতা’, যেখানে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন রোগী।
ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক ও ব্যবস্থাপকদের দেখা যায় তারাই বেশি বেশি রোগী যেন আসে সে বিষয়ে তাদের অধনস্ত কর্মচারীদের নির্দেশনা দেন বলেন যে, যে যত বেশি রোগী দিতে পারবে তাকে তত বেশি কমিশন দেওয়া হবে। বিভিন্ন পরীক্ষার যে ফি নেওয়া হয়, আসলেই কি এই পরীক্ষা গুলো করতে এত টাকা খরচ হয়?
কয়েকটি রক্ত পরীক্ষার নাম বলি এবং এর সর্বোচ্চ খরচ কত টাকা সেটাও বলি, হয়ত স্থান ভেদে একটু তারতম্য হতে পারে।
যেমন রক্তের CBC test করতে কত টাকা লাগে।
সর্বমোট ১৫-৩০ টাকা।
এর সঙ্গে technician, electricity, machine depreciation, servicing, room/rent, report printing ইত্যাদি যোগ করলে পূর্ণ operational cost আনুমানিক ৳৪০–১০০ হতে পারে ল্যাবের volume ও মেশিনের ওপর নির্ভর করে।
অথচ রক্তের CBC test করতে ৪০০-৬০০ টাকা নিয়ে থাকে। এখানে কমিশন চলে যায় ৩০-৫০%।
যেমন রক্তের Lipid Profile CBC test করতে কত টাকা লাগে।
সর্বমোট ৩০-৮০ টাকা।
এর সঙ্গে technician, electricity, machine depreciation, servicing, room/rent, report printing ইত্যাদি যোগ করলে পূর্ণ operational cost আনুমানিক ৳৭০–১৩০ হতে পারে ল্যাবের volume ও মেশিনের ওপর নির্ভর করে। রক্তের Lipid Profile CBC test করতে ৮০০-১৪০০ টাকা নেওয়া হয়।এর জন্য চিকিৎসকরা দায়ী নয়। মুলত ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের সিন্ডিকেট।প্রায় অনেক পরীক্ষা আছে যেগুলোর ফি ৫-৮গুন মতো নেওয় হয়।একটি প্রতিষ্ঠান যুক্তিসংগত মুনাফা করতে পারে; একজন চিকিৎসক তার পেশাগত সেবার জন্য সম্মানী নিতে পারেন; একটি ল্যাব পরীক্ষার জন্য মূল্য নিতে পারে। কিন্তু রোগীর প্রয়োজনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আর্থিক প্রণোদনা চিকিৎসা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করলে সেটিই বড় নৈতিক সংকট।
এই জন্য বলতে চাই প্রয়োজন ‘কম পরীক্ষা’ নয়, ‘সঠিক পরীক্ষা’
এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য কোনোভাবেই রোগীদের পরীক্ষা করাতে নিরুৎসাহিত করা নয়।বরং
বার্তাটি হলো—
প্রয়োজনীয় পরীক্ষা অবশ্যই করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা বন্ধ করতে হবে।
একটি জাতীয় নীতিমালা এখন সময়ের দাবি
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের বিস্তার ঘটছে। DGHS-এর বর্তমান Facility Registry-তেও বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের তথ্য রয়েছে এবং বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল- ক্লিনিক আলাদাভাবে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। এই বিশাল ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শুধু লাইসেন্স প্রদান যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন—
লাইসেন্স + মান নিয়ন্ত্রণ + ক্লিনিক্যাল অডিট + আর্থিক স্বচ্ছতা + রোগীর অভিযোগ ব্যবস্থা + পেশাগত জবাবদিহিতা।
তাই চিকিৎসা ব্যবস্থায় এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে—
প্রয়োজনেই পরীক্ষা হবে, কমিশনের জন্য নয়।
রোগীর স্বার্থেই রেফারাল হবে, ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের জন্য নয়। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আয় হবে মানসম্মত সেবার মাধ্যমে, রোগীর অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে নয়।
শেষ কথা
একজন রোগী যখন চিকিৎসকের কাছে যান, তখন তিনি শুধু টাকা নিয়ে যান না—তিনি নিয়ে যান আস্থা। এই আস্থার মূল্য কোনো পরীক্ষার বিলের চেয়েও বেশি।চিকিৎসকের হাতে রোগীর জীবন ও স্বাস্থ্য; ডায়াগনস্টিক সেন্টারের হাতে পরীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা; সরকারের হাতে নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতার দায়িত্ব; আর রোগীর হাতে সচেতন হওয়ার অধিকার।
সম্পাদক ও প্রকাশক : সুজন মাহমুদ মোবাইল: 01713915888
নির্বাহী পরিচালক মোঃ আনিছুর রহমান মোবাইল: 01714236204
Copyright © 2026 sbtv24. All rights reserved.