
ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ কমিয়ে দারিদ্র্য হ্রাস করতে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর উদ্ধৃতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের তিনি এই তথ্য জানান।
এর আগে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও ব্যাংক অব আমেরিকার কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে।
ড. তিতুমীর বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সরকার সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ যতটা সম্ভব সীমিত রাখার চেষ্টা করছে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অতীতের দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করছে।
উপদেষ্টা আরও বলেন, অতীতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উপকারভোগী বাছাইয়ে ত্রুটি ছিল। যারা সহায়তার যোগ্য ছিলেন, তাদের অনেকের নাম তালিকায় নেই থাকা পাশাপাশি অযোগ্য ব্যক্তিও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এই সমস্যা সমাধানে সরকার ডিজিটাল জনপরিকাঠামো ব্যবহারে গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছায়।
স্বাধীন গবেষণা সংস্থার মূল্যায়নের বরাত দিয়ে ড. তিতুমীর বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের কার্যকর বাস্তবায়ন দরপণ দারিদ্র্য প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে। এসব কর্মসূচি কল্পনাপ্রসূত নয়, বরং প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচি পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
শুধু কঠোর মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয় বলकर তিনি রাজস্ব ও আর্থিক খাতের সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। সরকারের লক্ষ্য রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং কর ফাঁকি, কর জালিয়াতি ও পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। গৃহীত পদক্ষেপের ফলে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
তার Worten, গত অর্থবছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ থেকে ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। সংস্কার কার্যক্রমের বিশ্বাসযোগ্যতা কাজের ফলাফলের মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে।
আইএমএফের অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের ব্যাখ্যা প্রদানে সংশ্লিষ্ট শর্ত ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি বলে মন্তব্য করে ড. তিতুমীর বলেন, সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হলে কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, সেই প্রেক্ষাপটেও আইএমএফের পূর্বাভাস দেখতে হবে। অতীতে শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকার সংস্কারের মাধ্যমে তা দূর করতে চায়।
ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও আমানতকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, অতীতে ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের কারণে প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি সামনে এসেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারছেন। আমানত উত্তোলনের পাশাপাশি অনেকেই অর্থ জমা রাখছেন, যা আস্থা ফেরার ইঙ্গিত দেয়। এ ছাড়া ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমে আসাও আর্থিক খাতে পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক লক্ষণ।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সারের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। সংকটের কারণে সৃষ্ট বাড়তি খরচের হিসাব করলেই অর্থনীতির ওপর এর পূর্ণ প্রভাব বোঝা যাবে না। কৃষকদের ওপর চাপ কমাতে ডিজেলের দাম না বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। সংকট সৃষ্টিতে বাংলাদেশের ভূমিকা না থাকলেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সরকার এর প্রভাব মোকাবিলায় কাজ করছে।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র ও রপ্তানির প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার কৌশল নিয়ে থাকেন। সরকারের লক্ষ্য নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমিয়ে টেকসই উন্নয়নের পথ তৈরি করা।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। বৈশ্বিক অর্থনীতি, উন্নয়ন অর্থায়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও আর্থিক খাতের সংস্কার সভায় আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এই সভা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে অর্থনৈতিক সংস্কার, উন্নয়ন অর্থায়ন ও নিজস্ব অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
সম্পাদক ও প্রকাশক : সুজন মাহমুদ মোবাইল: 01713915888
নির্বাহী পরিচালক মোঃ আনিছুর রহমান মোবাইল: 01714236204
Copyright © 2026 sbtv24. All rights reserved.