
আসিফ মাহমুদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি, চাঁদাবাজি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ প্রয়োজন এবং আগামী ৩০ অক্টোবর শাহবাগে গণবিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছেন।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উত্তরার রাজলক্ষ্মী এলাকায় আয়োজিত একটি লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই দাবি করেন। এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন যে সরকার দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। কণ্ঠশিল্পী ও বিএনপির সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মী আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলির ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। তিনি প্রশ্ন করেছেন যে একজন পরিচিত ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে আসিফ মাহমুদ বলেন, যিনি নিজের এলাকাতে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন না, তিনি সারা দেশের মানুষের নিরাপত্তা দেওয়ার যোগ্য কি না তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিবর্তে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে ধরে আসিফ মাহমুদ বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম থেকে শুরু করে বাজারের বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বেড়েছে। অনেক পণ্যের দাম ৫০-১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অথচ সাধারণ মানুষের আয় ও বেতন সেই অনুপাতে বাড়েনি।
তিনি জানান, শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) কারওয়ান বাজারে গিয়ে তারা প্রতি কেজি টমেটোর দাম ২০০ টাকা দেখেছেন। তার ভাষ্যমতে, যে টমেটোর কেজি ২০০ টাকা, একসময় সেই দামে ব্রয়লার মুরগি পাওয়া যেত।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান চালানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর এবং বিশেষ করে নির্বাচনের পর গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটগুলো ভেঙে সাধারণ মানুষের জন্য সুলভ মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিশ্চিত করতে হবে। অভিযানের নামে অনিয়ম বা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ থাকলে তারও স্বচ্ছ তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
দেশে চাঁদাবাজির বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি অভিযোগ করেন, চাঁদাবাজি এখন দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি গবাদিপশুর খাবারের ঘাস নিয়েও চাঁদা দাবি এবং চাঁদা না দিলে ঘাসে বিষ মেশানোর মতো ঘটনার অভিযোগ রয়েছে।
সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, জনগণের ধৈর্যেরও সীমা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিভিন্ন খাতের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মানুষ আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে।
সরকারের এক প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অস্ত্র প্রদর্শন করে মাদকবিরোধী অভিযানের অভিযোগ এবং পরে তাকে অপসারণের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন আসিফ মাহমুদ। তার প্রশ্ন, ওই প্রতিমন্ত্রী কোনো নৈতিক বা ফৌজদারি অপরাধ করে থাকলে শুধু পদ থেকে সরিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়; অভিযোগের ধরন অনুযায়ী স্বচ্ছ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
অপরাধের অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে দায় এড়ানোর সুযোগ তৈরি করা উচিত নয়। সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত সবার ক্ষেত্রে আইন সমানভাবে প্রয়োগের দাবি জানান তিনি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে সরকারের অন্যতম ব্যর্থতার ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন আসিফ মাহমুদ। তার অভিযোগ, মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রাহকদের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের চাপও বেড়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অনিয়ম এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এই খাতে দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেন তিনি। তার বক্তব্য, সরকারকে গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক হিসেবে প্রমাণ করতে হলে ব্যর্থতার দায় নিতে হবে এবং জনগণের ভোগান্তি কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগ এবং কর্মসংস্থান নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন আসিফ মাহমুদ। তিনি অভিযোগ করেন, চাকরিপ্রত্যাশীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে দলীয় লোকজনকে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। চাকরির জন্য অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠনের পরও তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের কর্মসংস্থান ও চাকরির সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে।
বিভিন্ন খাতে সরকারের ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে বিরোধী পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন হলে তা দেওয়ারও প্রস্তাব দেন তিনি।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আসিফ মাহমুদ জানান, এসব সংকটের প্রতিবাদে জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তর ও দক্ষিণের উদ্যোগে আগামী ৩০ অক্টোবর শাহবাগে গণবিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে। ওই কর্মসূচিতে অংশ নিতে উত্তরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে রাজলক্ষ্মীর পেছনের সড়ক দিয়ে আজমপুর পর্যন্ত লিফলেট বিতরণ করে আসিফ মাহমুদ। পরে আজমপুর মহাসড়কে নেতাকর্মীদের নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন তিনি।
বিক্ষোভ মিছিলকালে নেতাকর্মীরা “কার্ড দিয়ে করব কী, দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি”, “তেল দে, গ্যাস দে, নাইলে গদি ছেড়ে দে”, “ক্ষমতা না জনতা, জনতা জনতা”, “ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ”সহ নানান স্লোগান দেন।
বাংলাদেশ জার্নাল/সিএম
মন্তব্য করুন