
নিউজ ডেস্কঃ
মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রিপাবলিকানরা; যুদ্ধের অর্থায়ন, শুল্কনীতি ও অভিবাসন ইস্যুতে কঠোর নজরদারির সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টি। নির্বাচনে জয়লাভ করে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে যাচ্ছে।
নতুন কংগ্রেস আগামী জানুয়ারির শুরুতে দায়িত্ব গ্রহণ করলে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছর রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস এবার বিরোধী দলের হাতে চলে যাওয়ায় প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারি ও জবাবদিহি বাড়বে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি, অভিবাসন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে ট্রাম্পকে নতুন করে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। তবে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকছে না।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে ইরান ইস্যুর কিছুটা ভূমিকা থাকতে পারে। তবে ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপের গুরুত্বও ভোটাররা উপলব্ধি করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের অসন্তোষও নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে কংগ্রেসের আগাম অনুমোদন ছাড়াই ইসরাইলের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেন ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট হিসেবে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের নির্বাহী ক্ষমতা তাঁর হাতে থাকলেও নতুন কংগ্রেসের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা।
বিশেষ করে সামরিক অভিযানের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব কংগ্রেসে আটকে দেওয়া হলে ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আগামী ১১ ডিসেম্বর বর্তমান সরকারি বাজেটের মেয়াদ শেষ হলে নতুন অর্থায়ন নিয়ে আইনপ্রণেতাদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে যুদ্ধের মধ্যে মার্কিন সেনারা মাঠপর্যায়ে অবস্থান করায় সামরিক অর্থায়ন বন্ধ করা সহজ হবে না বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সেন্টার অন ইউএস পলিটিক্সের গবেষক জেমস বয়েজ। তাঁর মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা ও জীবন ঝুঁকির প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। ফলে কংগ্রেসের মধ্যে এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন ব্যবহার করে প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতা সীমিত করার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই আইনের আওতায় প্রেসিডেন্টের সামরিক অভিযানের বিষয়ে কংগ্রেসকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অবহিত করতে হয় এবং সাধারণত ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন না পেলে অভিযান বন্ধ করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। তবে প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা থাকায় কংগ্রেসের পক্ষে সিদ্ধান্ত কার্যকর করা কঠিন হতে পারে।
ভেটো বাতিল করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। ডেমোক্র্যাটদের বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা এই পর্যায়ের নয়। ফলে যুদ্ধ বন্ধে তাদের রিপাবলিকান সদস্যদের একটি অংশের সমর্থন আদায় করতে হবে।
আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনভিত্তিক ইউসিডি ক্লিনটন ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অধ্যাপক স্কট লুকাসের মতে, ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি নিয়ে অসন্তুষ্ট রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করে ডেমোক্র্যাটরা নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুদ্ধের বিষয়ে তাঁর পূর্ববর্তী আপত্তি এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আলোচনার বিষয় হতে পারে।
তবে জেমস বয়েজের আশঙ্কা, দ্বিতীয় মেয়াদ শেষে ট্রাম্প আর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ফলে নির্বাচনী পরাজয়ের আশঙ্কা কম থাকায় তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারেন। এমনকি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দুর্বল অবস্থান কাটিয়ে উঠতে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শুল্কনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ট্রাম্প। তাঁর এই নীতি আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক উত্তেজনা তৈরি করে।
পরবর্তী সময়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে প্রশাসন বিকল্প আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে শুল্কনীতি অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে।
ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, অতিরিক্ত শুল্কের কারণে আমদানিপণ্যের দাম বেড়ে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো শুল্কের অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করে ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়।
নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা বাণিজ্যনীতি নিয়ে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড় এবং বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বাণিজ্যনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হলে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে।
এদিকে চীনের প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিষয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত সেমিকন্ডাক্টর চিপ এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়গুলোতে দুই দলের কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকতে পারে।
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ফলে কংগ্রেসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির নেতৃত্ব তাদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সরকারি ব্যয় এবং নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমের ওপর তদন্ত ও নজরদারি বাড়াতে পারবে দলটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের যুদ্ধ পরিচালনার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
এমনকি ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর রাজনৈতিক উদ্যোগও দেখা যেতে পারে। তবে অভিশংসনের উদ্যোগ সফল করতে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
অভিবাসন নীতিও ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি, গণবহিষ্কার কর্মসূচি এবং অভিবাসীদের আটক ও প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া নিয়ে কংগ্রেসে বিস্তারিত তদন্তের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষ করে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এবং মার্কিন কর বিভাগের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ের বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনার পরিকল্পনা করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা।
ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম অংশ ছিল অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ব্যাপক বহিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা। কিন্তু এই নীতি বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও মানবাধিকার সংগঠনের মধ্যে সমালোচনা রয়েছে।
নির্বাচনের আগে ফক্স নিউজের প্রকাশিত একটি জরিপে দেখা যায়, নিবন্ধিত ভোটারদের ৫৩ শতাংশ মনে করেন, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করেছে।
অন্যদিকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের দাবি, তাদের হেফাজতে থাকা প্রায় ৭০ শতাংশ অভিবাসীর বিরুদ্ধে কোনো না কোনো অপরাধসংক্রান্ত অভিযোগ বা মামলা রয়েছে। তবে সমালোচকরা এ পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের আইনি ব্যবস্থায় আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী হিসেবে গণ্য করা যায় না।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি করেছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে বাজেট অনুমোদন, প্রশাসনিক তদন্ত, সামরিক ব্যয় এবং নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশ, সামরিক সিদ্ধান্ত এবং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের হাতে এখনো উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রয়েছে। ফলে শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের মাধ্যমে ইরান যুদ্ধ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা সম্ভব হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
অধ্যাপক স্কট লুকাসের মতে, নির্বাচনের ফলাফল ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি দায়িত্বশীল রিপাবলিকানদেরও নতুন করে ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁরা চাইলে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করতে পারবেন এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারবেন।
সব মিলিয়ে, ডেমোক্র্যাটদের এই নির্বাচনী বিজয় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক সতর্কবার্তা। তবে ইরান যুদ্ধ বন্ধ হবে কি না, তা নির্ভর করবে কংগ্রেসের বাজেট ও আইন প্রণয়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, রিপাবলিকানদের অভ্যন্তরীণ অবস্থান এবং শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলের ওপর।
মন্তব্য করুন