
গভীর সমুদ্রের সেই ঘন অন্ধকারে হঠাৎ আলোর বিস্মৎকর দৃশ্য দেখা গেছে। সূর্যের আলো হাজার মিটার গভীরে পৌঁছায় না; চারদিকে ঘন অন্ধকার, তীব্র জলাধুসরণ আর অজানা বিপদের আশঙ্কা থেকে হঠাৎ নীল, সবুজ বা লাল আলো জ্বলে ওঠে। এ ঘটনাটি কেউ কল্পকাহিনি বললেও বিজ্ঞানীদের মতে এটি সমুদ্রের জীবন-যন্ত্রেরই একটি বৈশিষ্ট্য।
পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় সমুদ্রের এক গভীর অঞ্চলে মানুষ পরিচিত পরিবেশের নিয়মেও নতুন ঘটনা ঘটে। সাধারণ সমুদ্রের প্রায় দুইশ মিটার অঞ্চলকে সূর্যালোকে আচ্ছাদিত বলা হয়; এর উপর থেকে প্রায় এক হাজার মিটার অঞ্চলকে গোধূলি অঞ্চল বলা হয়। এর নিচে সূর্যের কার্যকর আলো পৌঁছে না, কিন্তু অন্ধকার মানেই আলো নেই না—সমুদ্রের বিভিন্ন প্রাণী নিজেদেরই আলো তৈরি করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা NOAA-এর তথ্য অনুযায়ী, মধ্যবর্তী গভীর সমুদ্রে বসবাসকারী প্রাণীদের মধ্যে বায়োলুমিনেস প্রায় সাধারণ একটি বৈশিষ্ট্য। নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রায় আশহাজার শতাংশ জীবদীপ্তির ক্ষমতা পাওয়া গেছে বলে তথ্যে উল্লেখ; তবে এই হার অঞ্চল ও প্রজাতির ভিত্তিতে ভিন্ন হতে পারে।
জীবদীপ্তির প্রক্রিয়ায় luciferin ও luciferase নামক উপাদান কাজ করে। অক্সিজেনে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপন্দ হয়, যার একটি অংশ আলো হিসেবে বেরোয়; এই আলো প্রায় শীতল বা cold light ধরনের। জেলিফিশ, স্কুইড, চিংচি, মাছ, সামুদ্রিক কৃমি ও ক্ষুদ্র প্ল্যাঙ্কটনের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।
অ্যাংলারফিশের মতো প্রাণী মাথার সামনে আলোকসংকেত দিয়ে শিকার আকর্ষণ করে; কিছু গভীর সমুদ্রের অ্যাংলারফিশ সরাসরি আলো না তৈরি করে ব্যাকটেরিয়ার সাহায্য নেয়। জেলিফিশের বিপদে উজ্জ্বল আলোর ঝলক সৃষ্টি করা হতে পারে, বিশেষত অ্যাটোলা জেলিফিশের; বিজ্ঞানীরা একে চোর ধরার সতর্কতার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
অনেক সামুদ্রিক প্রাণী নীল বা সবুজ আলো ব্যবহার করে, কারণ পানিতে এগুলো দীর্ঘদূর পৌঁছাতে পারে; লাল আলো পানিতে দ্রুত শোষিত হয় বলে গভীর সমুদ্রে লাল আলো অত্যন্ত বিরল। কিছু ড্রাগনফিশ এই ব্যবহার করে শিকার ধরে। কেউ কৌশলে নিজেদের অদৃশ্য করতে পারে, কেউ শিকারীকে বিভ্রান্ত করতে পারে, আবার কেউ নিজের অস্তিত্ব রক্ষার সংকেত দিতে পারে।
সমুদ্রের গভীর অন্ধকার পুরোপুরি আলোহীন নয়; সেখানে আলো জ্বলে—শিকারের আশায়, আত্মরক্ষার অস্ত্রে বা জীবন রক্ষার একটি সম্ভাব্য কৌশলে।
মন্তব্য করুন