
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানী পাটুয়ারটেক এলাকায় অবস্থিত টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে আগুনের ঘটনায় দশ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রিসোর্টটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। কাঠের তৈরি স্থাপনায় দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে সকাল আটটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তারের তত্ত্বাবধানে প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ততক্ষণে দশ জনের জীবন নেয় আগুন।
ঘটনায় অন্তত ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে প্রশাসন। তবে পরিচয় ও পারিবারিক সম্পর্ক নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাটি তদন্ত করতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুয়াইদ ১৭ অক্টোবর ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, রিসোর্টটির ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ছিল না। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেনের বক্তव्य অনুযায়ী, গত জুন মাসে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ১১ জুন নোটিশ দেওয়া হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার জানিয়েছেন, স্থাপনাটির বড় অংশ কাঠের তৈরি হওয়ায় সমুদ্রের বাতাসে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রিসোর্টটিতে বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেতব্যবস্থা, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল। স্থাপনাটি মাত্র সাত-আট মাস আগে নির্মিত হয়েছিল বলেও তিনি জানিয়েছেন।
পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুর্যান্ট নামে কোনো প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্রের জন্য আবেদনও করেনি বলে ধারণা করা হচ্ছে। জালিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম সৈয়দ আলম জানিয়েছেন, জায়গার মালিকানা নিয়ে বিরোধ ছিল।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ১২ ধারায় প্রযোজ্য প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়ার বিধান রয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন, ২০১৪ এবং অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন, ২০০৩-তেও নিবন্ধন, লাইসেন্স ও অগ্নিনিরাপত্তা অনুমোদন সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। তবে রিসোর্টটির ক্ষেত্রে কোন অনুমোদন আইনত বাধ্যতামূলক ছিল, তা সংশ্লিষ্ট বিধিমালা, প্রতিষ্ঠানের শ্রেণি ও নথিপত্র যাচাই করে নির্ধারণ করতে হবে।
দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩০৪ক ধারায় অবহেলাজনিত কাজের কারণে মৃত্যু ঘটলে শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে শুধু মালিক হওয়া বা অনুমোদন না থাকার তথ্য দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কারও ফৌজদারি দায় প্রতিষ্ঠিত হয় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবহেলা বা বেপরোয়া কাজের সঙ্গে প্রাণহানির কার্যকারণগত সম্পর্ক তদন্তে প্রমাণিত হতে হবে। তদন্তে রিসোর্টের মালিকানা, পরিচালনার অধিকার, নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব, পূর্ববর্তী সতর্কবার্তার পর গৃহীত পদক্ষেপ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকাও যাচাই করার প্রয়োজন আছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ ও চিহ্নিত অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে উल्लেখ করা হয়েছে। নিহত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণে তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করা উচিত।
মন্তব্য করুন