
ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে লাউ চাষে বাম্পার ফলন হওয়া সত্ত্বেও কৃষকরা বাজারে ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, যার ফলে চরম লোকসannes পড়েছেন। মাঠ পর্যায়ে প্রতি পিস লাউ এক থেকে চার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, কোথাও কোথাও চারটি লাউ এক টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর মানে প্রতিটি লাউয়ের দাম দাঁড়াচ্ছে মাত্র ২৫ পয়সা। অন্যদিকে শহরের খুচরা বাজারে একই লাউ ২০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
উৎপাদন খরচ, সার, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ মেটাতে অক্ষম অনেক কৃষক বাগানের পরিচর্যা বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ বাগান কেটে ফেলছেন, আবার কেউ অবিক্রীত পাকা লাউ জমিতেই ফেলে রেখেছেন। কিছু জায়গায় এই লাউ গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষক আদিল ইসলাম পাঁচ একর জমিতে লাউ চাষ করেছেন। তিনি জানান, চাষে তার প্রায় তিন লাখ আশি হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ক্ষেতের আশি শতাংশ লাউ বিক্রি করে মাত্র নব্বই হাজার টাকা পেয়েছেন, যা শ্রমিকের মজুরি পরিশোধের জন্যও পর্যাপ্ত নয়। গত আট দিন দেখভাল না করার কারণে বাকি লাউয়ে ছত্রাক ধরে অনেক লাউ নষ্ট হয়েছে।
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার কিসমত এলাকার কৃষক হাসিনুর রহমান ধারদেনা করে দশ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছিলেন। তার অভিযোগ, বাজারে দাম না থাকায় খরচ তোলার বদলে ঋণের বোঝা বাড়ছে। তিনি সরকারি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ्यानুসারে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় ৪৬৬ হেক্টর জমিতে লাউ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা ছিল এবং ওই অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ১৬ হাজার ৬৩৯ টন। চলতি বছরের পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন-পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম বলেন, পঞ্চগড়, রংপুরসহ আশপাশের জেলাগুলোতে এবার লাউয়ের বাম্পার ফলন হয়েছে। এর ফলেই পাইকারি ক্রেতাদের আগ্রহ কমেছে।
পঞ্চগড়ের ব্যবসায়ীদের মতে, ঢাকা ও অন্যান্য জেলায় লাউয়ের চাহিদা তুলনামূলক কম। পণ্য ওঠানো-নামানো ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের খরচও বেড়েছে। সব মিলিয়ে কৃষকের কাছ থেকে কম দামে লাউ কিনেও বাজারজাত করতে নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন তারা।
অন্যদিকে, জেলা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মুয়াল্লিমা খানম বলেন, পর্যাপ্ত জনবল না থাকলেও তারা বাজার তদারকি করছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ ক্রমাগত বাড়লেও কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। তাদের মতে, বাম্পার ফলন আশীর্বাদের বদলে অভিশাপে পরিণত হয়েছে। উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে খরচ তুলতে না পারলে পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদের পুঁজি জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও বাজারের বিস্তারিত তথ্য না পাওয়ার পর্যন্ত সংকটের সব কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার সমন্বয় এবং পরিবহন খরচ কমানোর বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনার দাবি রাখে।
মাঠভরা লাউয়ের বিপরীতে কৃষকের ঘরে লোকসানের হিসাব যখন রয়েছে, তখন এই সংকট শুধু একটি সবজির দাম কমে যাওয়ার ঘটনা নয়; এটি কৃষকের উৎপাদন খরচ, বাজারব্যবস্থা এবং ন্যায্য মূল্য পাওয়ার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
মন্তব্য করুন