
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে পদত্যাগের কথা ভাবছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতেই তিনি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হতাশাজনক ফলাফল এবং ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক চাপ রুবিওর পদত্যাগের চিন্তাকে আরও জোরালো করেছে। তবে এ বিষয়ে রুবিও কিংবা হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে রুবিওর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ফলে প্রশাসনে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখলে ট্রাম্পের বিতর্কিত নীতির দায় তাঁর ওপরও বর্তাতে পারে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ নিয়ে জনমনে অসন্তোষ বাড়তে থাকায় এ পরিস্থিতি তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনে ওয়াশিংটনের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের দায় থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং যুদ্ধের রাজনৈতিক দায়িত্ব প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপরই সীমাবদ্ধ রাখা রুবিওর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর প্রশাসনের চার থেকে পাঁচজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পদত্যাগ করতে পারেন বলেও বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।
এদিকে নির্বাচনী বিপর্যয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর বক্তব্য, এই যুদ্ধের কারণেই রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ফলাফল খারাপ হয়েছে। তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র কোন পথে এগোবে, তা নিয়ে এখনই সৎ ও বাস্তবভিত্তিক আলোচনা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের আশঙ্কা, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিশংসনসহ নানা রাজনৈতিক উদ্যোগ জোরদার হতে পারে।
একসময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধে জড়িয়েছিলেন মার্কো রুবিও। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার সময় ট্রাম্প তাঁকে ব্যঙ্গ করে ‘লিটল মার্কো’ বলেও সম্বোধন করেছিলেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই সম্পর্কের আমূল পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে রুবিও ট্রাম্প প্রশাসনের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করছেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত আর্কাইভিস্ট এবং ইউএসএআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বও তাঁর হাতে আসে।
তবে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও পররাষ্ট্রনীতির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রুবিওকে পাশ কাটিয়ে প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান প্রচেষ্টায় স্টিভেন উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
রুবিওর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ ছাড়াও লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন বিতর্কিত নীতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদক পাচারের সন্দেহে ছোট নৌযানে মার্কিন সামরিক হামলা এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আটক করার ঘটনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।
বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দেশটির অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পরিচালনায় রুবিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে এসব সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক জবাবদিহির মুখোমুখি হতে পারেন তিনি।
অন্যদিকে, রুবিও তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে চলমান জল্পনা-কল্পনা নাকচ করার চেষ্টা করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে সাংবাদিকদের তিনি জানিয়েছিলেন, আপাতত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং বর্তমান প্রশাসনের দায়িত্ব পালনে তিনি শতভাগ মনোযোগী।
তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, জেডি ভ্যান্স রিপাবলিকান দলের প্রার্থী হলে তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন।
তবে রুবিওর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মহলের কেউ কেউ মনে করছেন, প্রশাসন ছাড়ার সিদ্ধান্ত তাঁর জন্য অস্বাভাবিক হবে না। আবার অন্য একটি পক্ষের ধারণা, কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের মতো বড় কোনো ভূরাজনৈতিক ঘটনা পরিচালনার সুযোগ পেলে তিনি দায়িত্বে থেকে যেতে পারেন।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে অবশ্য রুবিওর পদত্যাগের বিষয়ে কোনো ইতিবাচক ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি। বরং প্রশাসনের মুখপাত্র ডেভিস অ্যাঙ্গেল এ ধরনের সংবাদকে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দাবি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে প্রশাসন ঐক্যবদ্ধভাবে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়নে কাজ করছে।
সব মিলিয়ে, মার্কিন রাজনীতিতে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে এখন থেকেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের অবস্থান নিয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনে রুবিওর ভবিষ্যৎ এবং জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আগামী দিনগুলোতে রিপাবলিকান দলের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে পদত্যাগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বিষয়টি রাজনৈতিক জল্পনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
তথ্য সূত্রঃদ্য ইনডিপেনডেন্টে
মন্তব্য করুন