
বাংলাদেশ সোসাইটি অব কোলন অ্যান্ড রেক্টাল সার্জন্স (বিএসসিআরএস) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘কোলোরেক্টাল সার্জারি সম্মেলন-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে মুখ্য অতিথি হিসেবে উপস্থিত বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশে বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি রোগী বিদেশে যান। বিশেষায়িত চিকিৎসা ও আধুনিক প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার মান ও রোগীদের আস্থার সংকটই এর প্রধান কারণ। এতে প্রতি বছর বিশাল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা জরুরি।
চিকিৎসাসেবায় মানবিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, চিকিৎসা শুধু একটি পেশা নয়; এটি মানুষের জীবন, মর্যাদা ও আশার সঙ্গে জড়িত একটি মহান দায়িত্ব। রোগীদের সাথে মানবিক আচরণ, চিকিৎসার বিষয়গুলো সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলা, হাসপাতালের পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং অসচ্ছল রোগীদের প্রতি বিশেষ সহমর্মিতা দেখানো প্রয়োজন। আর্থিক সংকটের কারণে কেউ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
দেশের স্বাস্থ্য খাতের অতীত পরিস্থিতির সমালোচনা করেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি দাবি করেন, বিগত ১৭ বছরে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। সরকারি হাসপাতালে সাধারণ মানুষ সময়মতো চিকিৎসা, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত না করেই বিপুল অর্থ ব্যয়ে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়েছে, ফলে অনেক যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত পড়ে থাকায়। চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগে দীর্ঘদিনের স্থবিরতাও সংকটকে আরও গভীর করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এ ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি এড়াতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
বর্তমান সরকারের উদ্যোগের উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। বরাদ্দের প্রতিটি টাকা কার্যকর ও স্বচ্ছভাবে ব্যয় হোক, তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালগুলো পর্যায়ক্রমে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, টেকনিশিয়ানসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।
তিনি দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদান স্মরণ করেন। কোলোরেক্টাল রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এ ধরনের রোগে আক্রান্ত হলেও লজ্জা, সংকোচ ও অসচেতনতার কারণে অনেকে সময়মতো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না, ফলে রোগ জটিল হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সহজলভ্য বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে একটি জাতীয় কোলোরেক্টাল সার্জারি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হলে তিনি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনের মাধ্যমে দেশের তরুণ চিকিৎসকরা বিশ্বের খ্যাতনামা সার্জনদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন, যা সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিএসসিআরএসের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনটির উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সাহাদত হোসেন শেখ। এছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এফ এম সিদ্দিকী, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদসহ চিকিৎসক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বিএসসিআরএসের পক্ষ থেকে মুখ্য অতিথিকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
দুই দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা কোলোরেক্টাল সার্জারির আধুনিক পদ্ধতি ও প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করবেন। পাশাপাশি দেশের তরুণ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ থাকবে।
মন্তব্য করুন