
নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকার আশুলিয়ায় পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ ও অসন্তোষের জেরে ২৬৪টি পোশাক কারখানায় এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ এবং কালো তালিকাভুক্ত না করাসহ তিন দফা দাবিতে সোমবার সকাল থেকে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের দেওয়া আগুনে একটি কাভার্ড ভ্যানের সামনের অংশ পুড়ে যায়। সংঘর্ষে অন্তত ১২ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। পরে দুপুরের দিকে শ্রমিকেরা নিজ নিজ বাসায় ফিরে গেলে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয় বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ।
শিল্প পুলিশ ও কারখানা সূত্রে জানা গেছে, সকালে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকেরা নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বাড়ইপাড়া এলাকায় অবস্থান নেন। খবর পেয়ে আশুলিয়া থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়।
অন্যদিকে, বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রেখে কারখানা থেকে বের হয়ে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও অবরোধের চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাঁদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
শ্রমিকদের একপর্যায়ে পিকার্ড বাংলাদেশ লিমিটেড, জনরন সোয়েটার লিমিটেড, ফেরারি গার্মেন্টস লিমিটেড, ডেনিটেক্স লিমিটেড, আনলিমা টেক্সটাইল লিমিটেড, আল ইসলাম টেক্সটাইল লিমিটেড ও জিকিউ ইন্ডাস্ট্রিজের সামনে থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও লাঠি নিক্ষেপ করা হয়। এতে ১২ জনের বেশি পুলিশ সদস্য আহত হন বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে।
এদিকে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় নিউএজ গ্রুপের দুটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সকালে কাজে যোগ দিলেও উৎপাদন বন্ধ রেখে কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে তাঁরা কারখানা থেকে বের হয়ে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে অবস্থান নেন। বেলা ১১টার দিকে নরসিংহপুরে হা-মীম গ্রুপের একটি কারখানার সামনে রাখা কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। এতে গাড়িটির সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শ্রমিক অসন্তোষের কারণে নিট এশিয়া, আল-মুসলিম, ট্রাউজার লাইন ও অনন্ত গার্মেন্টসসহ আশুলিয়ার ২৬৪টি কারখানায় সোমবারের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ছুটির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নিতে চাইলে পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
নিউএজ পোশাক কারখানার এক শ্রমিক জানান, রোববারের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের কারখানার দুই শ্রমিককে আটক করা হয়েছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে শ্রমিকেরা একযোগে কারখানা থেকে বের হয়ে কর্মবিরতিতে অংশ নেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, সকালে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিয়ে কর্মবিরতি শুরু করেন। নিউএজের দুই শ্রমিককে আটকের খবরকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গ্রেপ্তারের ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য নাশকতা এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ২৬৪টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। দুপুরের পর শ্রমিকেরা বাসায় ফিরে যাওয়ায় পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে।
ঢাকার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, পোশাকশিল্পে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগে ইতিমধ্যে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
এদিকে ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান আশুলিয়া ও সাভারের শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও যারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ভিন্ন হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁদের ইন্ধনদাতাদের সম্পর্কেও পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
মন্তব্য করুন