
মার্কিন নৌঅববোধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পরও ইরান সামরিক সরঞ্জাম আমদানি চালিয়ে যাচ্ছে বলে এক অনুসন্ধানে জানা গেছে। দেশটি এ কাজে পাঁচ হাজারের বেশি গোপন সামরিক ও আর্থিক সংস্থার একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এই সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কমপক্ষে ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক ও ভারী ট্রাক আমদানি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (এমওডি) নামের আদ্যক্ষর দিয়ে পরিচিত এসব সংস্থা দেশটির সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ ও নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর একটি বিস্তৃত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তাদের আর্থিক লেনদেনের চিহ্ন ২০১৬ সাল থেকে বিভিন্ন পণ্য পরিবহন নথি ও বাণিজ্যিক তথ্যে পাওয়া গেছে।
রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এসব সংস্থার কয়েকটির সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং দেশটির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কীভাবে যুদ্ধের মধ্যেও ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুদ পুনর্গঠন করছে, তার একটি চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির উপকরণ আমদানিপ্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১৮ মাসে এমওডি ৩৪৬৪২৮ নামের একটি সংস্থা বিপুল পরিমাণ রকেটের জ্বালানি, বিস্ফোরক, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং ভারী ট্রাক আমদানি করেছে। এসব উপকরণ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই আমদানির তালিকায় ছিল ১৯ লাখ ডলারের ডেটোনেটর, কয়েক টন বিস্ফোরক, উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, রকেট জ্বালানির উপাদান এবং ভারী যানবাহন। এসব সরঞ্জাম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও শাহেদ সিরিজের ড্রোন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা জানান।
ইরানের সামরিক বাহিনী ইউরোপ থেকে বিপুলসংখ্যক আইভেকো ট্রাক এবং জাপান থেকে টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার সংগ্রহ করেছে। এসব ট্রাকের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান হিসেবে এবং কিছু সামরিক অস্ত্র বহনে ব্যবহার করা যায়।
স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে আসছে সরঞ্জামরয়টার্সের পর্যালোচনা করা নথি অনুযায়ী, চীন, রাশিয়া, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইরানে সামরিক সরঞ্জাম এসেছে। রাশিয়া থেকে কাস্পিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজে, মধ্য এশিয়া থেকে ট্রাকে এবং চীন থেকে কার্গো বিমানে এসব সরঞ্জাম পৌঁছেছে।
চলতি বছরের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও সরবরাহ বন্ধ হয়নি। আমদানি তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে কেনা ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য ইরানে এসেছে, যার প্রায় সবই সমুদ্রপথে পরিবহন করা হয়েছে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নৌঅববোধ সাময়িক স্থগিতের ঘোষণার নয় দিন পর, ২৭ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইলেকট্রনিকস পণ্যবাহী একটি চালান ইরানে পৌঁছায়। পরে জুলাইয়ের মাঝামাঝি অবরোধ আবার কার্যকর করা হয়।
কীভাবে নিষেধাজ্ঞা এড়াচ্ছে ইরান?রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইরানের এসব সংস্থা বিদেশে বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পণ্য কেনে। এসব মধ্যস্থতাকারীকে নথিতে ট্রাস্টি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদেশে থাকা ব্যাংক হিসাবে রাখা অর্থ ব্যবহার করে তাঁরা সরঞ্জাম কেনেন এবং ইরানে পাঠান।
বিশেষ বিষয় হলো, রয়টার্সের পর্যালোচনা করা চালানের ৯৭ শতাংশের ক্ষেত্রেই সরাসরি মুদ্রা স্থানান্তর ছাড়াই লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর নজর এড়িয়ে পণ্য আমদানি করা সম্ভব হয়েছে।
এ ছাড়া এসব সংস্থার অধিকাংশই ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনীর লজিস্টিক বিভাগের একই তেহরান ঠিকানা ব্যবহার করে। তাদের প্রতিষ্ঠার তারিখ হিসেবে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি উল্লেখ থাকলেও নথি অনুযায়ী, অধিকাংশ সংস্থা প্রকৃতপক্ষে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণরয়টার্সের অনুসন্ধান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের অর্থনৈতিক অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সামরিক কর্মসূচিতে অর্থায়নের ইরানের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও স্বীকার করেন তিনি।
অন্যদিকে সাবেক মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মিয়াদ মালেকি বলেন, এই নেটওয়ার্ক ইরানের সামরিক বাণিজ্যের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। তাঁর মতে, যুদ্ধের সময় এবং তার আগেও এটি ইরানের সামরিক বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা হিসেবে কাজ করেছে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পিটার স্যালিসবারি বলেন, আমদানির তথ্য থেকে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠন বা সম্প্রসারণের একটি বৃহৎ উদ্যোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাঁর মতে, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নতুন সরবরাহপথ খুঁজে নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে ইরানের।
এদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সের অনুসন্ধানে উল্লিখিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত নয় বলে জানিয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, হোয়াইট হাউস ও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
ইরানের সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও মন্তব্য চাওয়া হয়েছিল। তবে তারা রয়টার্সের বিস্তারিত প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
মন্তব্য করুন