
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ ঘাটতি বাড়ছে, সাশ্রয়ী অর্থায়নের তাগিদ
দেশে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বার্ষিক বিনিয়োগ প্রায় ১৫৪ কোটি ডলার হওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে এই খাতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে মাত্র ১৯ কোটি ডলার। ফলে বছরে প্রায় ১৩৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ঘাটতি থাকছে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতের জলবায়ু অর্থায়নের প্রায় ৯০ শতাংশই আসছে ঋণের মাধ্যমে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
বেসরকারি সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণায় এই পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। গত মঙ্গলবার ঢাকায় এক জাতীয় সংলাপে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রয়োজনের মাত্র ১৩ শতাংশ বিনিয়োগ হচ্ছে। ফলে বছরে বিনিয়োগ ঘাটতি থাকছে প্রায় ১৩৫ কোটি ডলার। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জ্বালানি খাতে প্রতি ১ ডলার অনুদানের বিপরীতে ১ দশমিক ৫৩ ডলার ঋণ পাওয়ার তুলনায় বাংলাদেশের প্রতি ১ ডলার অনুদানের বিপরীতে প্রায় ৯ ডলার ঋণ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে দেশের ওপর এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
গবেষণাটি কপ৩১ সম্মেলনের আগে প্রকাশিত হওয়ায় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সরকারের প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন থাকতে হবে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রসার, আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশ সুরক্ষা জোরদার এখনকার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে কপ সম্মেলনে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি তুলে ধরতে হবে এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করতে হবে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, ২০০২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত জ্বালানি খাতের জলবায়ু অর্থায়নে ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণ এবং মাত্র ৭ শতাংশ অনুদান পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিনিয়োগের ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণ হিসেবে এসেছে। পাঁচটি বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকের সম্ভাব্য বার্ষিক সরকারি অর্থায়নের পরিসর ৬৩০ কোটি ডলার হলেও, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রযোজ্য অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি মাত্র ৮২ কোটি ডলার। অনুমোদিত অর্থ ছাড় করতেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের নথি অনুযায়ী, একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থায়ন সুবিধা অনুমোদনের পাঁচ বছর পরও মাত্র ১২ শতাংশ অর্থ ছাড় হয়েছিল।
গবেষণাটি অনুদানের পরিমাণ কম এবং ঋণের চাপ বেশি হওয়ার কারণে সাশ্রয়ী অর্থায়ন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কৃষক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থায়ন সহজ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
গবেষণায় অর্থায়নের শর্ত সহজ করার পাশাপাশি বিশেষ তহবিল ‘রিনিউয়েবল এনার্জি সভরেইনটি ফ্যাসিলিটি’ (আরইএসএফ) গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই তহবিলটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) পরিচালনা করবে এবং পিকেএসএফ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রকল্পে সহায়তা করবে। অনুদানের মাধ্যমে প্রকল্প প্রস্তুতি ব্যয় কমানো এবং গ্যারান্টির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে সাশ্রয়ী টাকায় ঋণ দেওয়ার উৎসাহিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
মডেলভিত্তিক অর্থায়ন পরিস্থিতি অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ৭৯০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ চাহিদা পূরণে সার্বভৌম ঋণের প্রয়োজন কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। তবে গবেষণায় বলা হয়েছে, অর্থায়নের ধরন পরিবর্তন করা গেলে সরকারি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। এটি মডেলভিত্তিক হিসাব, নিশ্চিত অর্থায়ন বা অর্জিত ফল নয়।
গবেষণায় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই সবুজ অর্থায়নের সুযোগ তৈরি, অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং নেট মিটারিং নীতিমালা স্থিতিশীল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সাশ্রয়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতে এবং নতুন ঋণের চাপ সীমিত রাখতে আহ্বান জানিয়েছেন।
মন্তব্য করুন