
কক্সবাজারের মহেশখালী চ্যানেলে বালু উত্তোলনকে ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, পরিবেশগত ঝুঁকি ও প্রশাসনিক শর্ত উপেক্ষা করে রাতের বেলায়ও ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। এ বিষয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ এবং আদালতের হস্তক্ষেপের পরও কার্যক্রম বন্ধ না হওয়ায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
গত ১৫ অক্টোবর রাতে সরেজমিনে দেখা গেছে, মহেশখালী চ্যানেলের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছিল। অভিযোগ রয়েছে, মাতারবাড়ী বন্দরের জন্য সড়ক নির্মাণের জন্য জেলা প্রশাসন কর্তৃক অনুমোদিত এলাকা ছাড়িয়ে এবং নির্ধারিত সময়ের পরও এই কার্যক্রম চলছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
মাতারবাড়ী বন্দরের জন্য সড়ক নির্মাণের জন্য ‘টোকিও-এমআইএল-জেভি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন হামিদারদিয়া ও ঠাকুরতলা মৌজা থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি অনুমোদিত এলাকা ছাড়িয়ে মহেশখালী চ্যানেল, আদিনাথ পাহড় এলাকার মোহনা ও বাঁকখালী খালের মোহনা থেকেও ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু তুলছে।
শুধু এলাকা ছাড়াই নয়, অভিযোগ রয়েছে, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও সময়সীমা-সংক্রান্ত শর্তও অমান্য করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় ১৮ ইঞ্চি কাটার ব্যবহারের নির্দেশনা থাকার কথা বলা হলেও সেখানে ১২ ইঞ্চি কাটার ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সন্ধ্যা ছয়টার পর বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকার শর্তও মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে রাতেও ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করতে দেখা গেছে।
মহেশখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মো. জয়নাল আবেদীন জনস্বার্থে হাইকোর্টে একটি রিট করেন। রিটের শুনানি শেষে গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ভারুয়াখালী মোহনা, বাঁকখালী মোহনা ও মহেশখালী চ্যানেলে চার মাসের জন্য ড্রেজিং ও বালু উত্তোলনের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরে ৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের ওই আদেশের ওপর দুই সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দেন। একই সঙ্গে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালতের এই আদেশের পরও সংশ্লিষ্ট এলাকায় বালু উত্তোলন চলার অভিযোগ উঠেছে। তবে সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশের সুনির্দিষ্ট পরিধি এবং এর ফলে কোন কার্যক্রম কীভাবে প্রভাবিত হয়েছে, তা জানা যায়নি।
পরিবেশসচেতন ব্যক্তিদের আশঙ্কা, অনুমোদিত সীমার বাইরে এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়াই বালু উত্তোলন চলতে থাকলে চ্যানেলের স্বাভাবিক প্রবাহ, তীরের স্থিতিশীলতা ও আশপাশের পরিবেকী ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় মানুষের বসতবাড়ি ও জীবিকার ওপর।
বিশেষ করে মহেশখালীর পাহড়সংলগ্ন এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজিংয়ের ফলে ভূমির স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে পাহড়ধস বা বসতভিটা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা কতটা বাস্তব, তা নির্ধারণে প্রয়োজন পরিবেশগত ও কারিগরি সমীক্ষা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের কারণে এলাকাবাসীর উদ্বেগ বাড়লেও বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। তাঁদের দাবি, অনুমোদনের শর্ত, উত্তোলনের সীমানা ও সময়সীমা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা সরেজমিনে যাচাই করতে হবে।
মহেশখালীবাসীর দাবি, বালু উত্তোলনের অনুমতিপত্র, নির্ধারিত এলাকা, ব্যবহৃত ড্রেজারের কারিগরি বৈশিষ্ট্য এবং আদালতের আদেশের আলোকে পুরো কার্যক্রমের নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। অনুমোদনের বাইরে বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নির্মাণসামগ্রীর প্রয়োজন থাকলেও সেই অজুহাতে পরিবেশ, আইন ও জনস্বার্থ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাই মহেশখালী চ্যানেল ও আশপাশের এলাকায় বালু উত্তোলনের বৈধতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ জরুরি।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ চেষ্টাও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য করুন