২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১:০৭ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

'গুপ্ত-সুপ্ত' বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলছে?

গুপ্ত-সুপ্ত রাজনীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়ছে

বangladesher রাজনৈতিক পরিদর্শনে বর্তমানে ‘গুপ্ত’ বা ‘সুপ্ত’ রাজনীতির কথা সবচেয়ে বেশি গूंজছে। ৫ আগস্ট স্বৈরাচারীর শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর এই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান থেকে लेकर জামায়াত-শিবির ażনালী পর্যন্ত নেতারা একে অপরেরকে ‘গুপ্ত’ আখ্যা দেয়ে দুর্নীতি বা অনুপ্রবেশের অভিযোগ লাঙ্গ করছেন। এই বিতর্কে কে কী পরিকল্পনা করছে, কে কে দলে অনুপ্রবেশকারী, আর কে গোপনে কাজ করছে—এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাসের স্তর অতিরিক্ত গভীর হয়ে ওঠে।

গত ১ অক্টোবর ফেনীতে এক বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকাশ্যে কোনো নাম না নিলেও তার নিশaneyায় যে জামায়াতে ইসলামী ছিল, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে স্পষ্ট। তার বক্তব্যে তিনি বলেন, “তাদেরকে কখনো রাজপথে দেখেছেন? তারা রাজপথে ছিল না। এই তারা এবং ওরা, ওই যে যারা পালিয়ে গেছে—স্বৈরাচার এবং গুপ্ত, তারা আবার একজোট হয়েছে। বরাবরই তো তারা একসঙ্গে ছিল। ১৯৯১ সালেও তারা একসঙ্গে ছিল, ১৯৮৬ সালের নির্বাচনেও একসঙ্গে ছিল। এমনকি গত নির্বাচনের সময়ও তারা তলে তলে কাজしていた। মূলত এ原因이 তাদেরকে ‘গুপ্ত’ বলা হয়।” এই বক্তব্যের মাত্র দুদিন পর ঢাকায় বায়তুল মোকাররমের সামনে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি কড়া ভাষায় বলেন, “বিশাল বিশাল প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়েছে। বিএনপি আসার কথা থাকলেও আসে নাই, অথচ জামায়াত-শিবির লড়াই করে জীবন দিয়েছে। আপনি সেই রক্ত দেওয়া জামায়াত-শিবিরকে আজ গুপ্ত বলছেন। আপনার অন্তত লজ্জা পাওয়া উচিত।”

শীর্ষ নেতাদের এই বাকযুদ্ধের পর গুপ্ত রাজনীতির প্রসঙ্গটি কেবল আর দুটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। গত ১৫ অক্টোবর সরকারের আরেক শরিক ও গণঅধিকার পরিষদের শীর্ষ নেতা নুরুল হক নুরও এই বিতর্কে ঘি ঢালেন। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াত বিভিন্ন প্রক্সি সংগঠন তৈরি করে রাজনীতির মাঠ ঘোলাটে করছে। তিনি বলেন, “এই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নামে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক দোকান খোলা হয়েছে, নতুন সাইনবোর্ড ঝুলছে এগুলোর আশি শতাংশই আসলে জামায়াত-শিবিরের প্রক্সি।”

বাংলাদেশে গুপ্ত রাজনীতির এই চর্চা নিয়ে সবচেয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয় মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে একের পরেকে প্রকাশ্যে আসতে থাকেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতারা। আর তখনই অভিযোগ ওঠে যে, এসব নেতার অনেকেই গত দেড় দশক ধরে গোপনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ছাত্রলীগের ছত্রচ্ছায়ায় হলে থাকতেন। এই অভিযোগগুলো সবচেয়ে বেশি সামনে এনICES বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল Islam রাকিব বলেন, “তাদেরকে (শিবির) তো চেনাই যাচ্ছে না। তাদের পলিটিক্স আসলে কারা করছে, কী করছে সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। তারা প্রকাশ্যে কোনো কমিটিও দেয় না। তারা গোপনে কাউকে ডিবেটিং সোসাইটিতে পাঠায়, কাউকে সাংবাদিক সমিতিতে ঢোকায়। এভাবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতে তারা গুপ্তভাবে আধিপত্য তৈরি করে। যেহেতু ওইসব প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পদধারী কেউ নেতৃত্বে আসতে পারে না, তাই ছাত্রদলের নেতারা সেখানে যেতে না পারলেও শিবির ঠিকই পারে। এই গুপ্ত অবস্থান থেকে তারা ক্যাম্পাসে যেকোনো সময় বড় ধরনের মব বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ফেলতে পারে।”

আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদের শাসনামলে ছাত্রদল ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে আসতে পারেনি, শিবিরও ছিল একরকম নিষিদ্ধ। কিন্তু ছাত্রদলের দাবি, তাদের প্রকাশ্য কমিটি থাকলেও শিবির এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ্যে আনছে না।

তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ।彼は反転して accusation करता है, “ছাত্রদল গত তিন-চার বছরে সারাদেশে মাত্র ত্রিশ-চল্লিশটা কমিটি দিতে পেরেছে, যা নিয়ে তারা গর্ব করে। অথচ আমরা প্রতি বছর জানুয়ারিতে ১৩২টি শাখায় নিয়মিত কমিটি করি। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটিও ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে। এরপরও তারা আমাদের গুপ্ত বলবে!”

হল কমিটি না দেওয়ার বিষয়ে ফরহাদ বলেন, “সাধারণ শিক্ষার্থীরা হলে দলীয় রাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। শিক্ষার্থীরা যদি প্রশাসনকে দলীয় রাজনীতির পক্ষে মত দেয়, তবেই আমরা হলে কমিটি দেব। আর ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত থাকার যে ভুয়া ছবি ছড়ানো হয়েছে, সেগুলো কোনো দলীয় প্রোগ্রামের নয়, বরং ডিবেটিং ক্লাবের অনুষ্ঠানের।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, গুপ্ত রাজনীতি বাংলাদেশে নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে এর ধরন বদলেছে। তিনি বলেন, “আগে গুপ্ত রাজনীতি বলতে বোঝাত নিষিদ্ধ বাম বা কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর আন্ডারগ্রাউন্ড কার্যক্রম। কিন্তু গত বিশ বছরে এই সংজ্ঞায় বিশাল পরিবর্তন এসেছে। এখন কোনো দল নিষিদ্ধ না হয়েও তারা অত্যন্ত সুকৌশলে হিডেন পলিটিক্স করছে। কখনো তারা অন্য দলের সঙ্গে মিশে যায়, আবার কখনো অন্য দলে অনুপ্রবেশ করে তথ্য চুরি করে।”

জোবাইদা নাসরীনের মতে, দলগুলোর মধ্যে এই অপ্রকাশ্য রাজনীতি নিয়ে যে সন্দেহ, তা এখন প্রতিটি দলের ভেতরেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। “বিএনপি মনে করে তাদের ভেতরে গুপ্ত কেউ আছে, কখনো সেটা আওয়ামী লীগের, কখনো জামায়াতের। আবার আওয়ামী লীগ মনে করে তাদের সুবিধাভোগীদের অনেকেই এখন বিএনপির গুপ্ত। এই লেবেল বা ট্যাগ এখন নিজ দলের নেতাদের ঘায়েল করতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। একে অপরের প্রতি এমন অবিশ্বাস দেশের রাজনৈতিক সুস্থতার জন্য বড় হুমকি।”

রাজনৈতিক দলগুলো সবসময় তাদের কৌশল প্রকাশ্যে আনে না। কিন্তু যখন কৌশল হিসেবে অন্য দলে অনুপ্রবেশের অভিযোগ সামনে আসছে, তখনি তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের সংকট। বিএনপি এই ইস্যুকে জোরালোভাবে সামনে আনছে মূলত ‘সংস্কার’ ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জামায়াতের বর্তমান অবস্থানকে কেন্দ্র করে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদীন ফারুক বলেন, “তারা (জামায়াত) সারাদিন সংস্কার নিয়ে কথা বলে। আমরাও সংস্কার চাই। কিন্তু তারা গুপ্তভাবে ষড়যন্ত্র করছে। তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে যে বিএনপি নাকি সংস্কার চায় না। তারা গুপ্তভাবে লংমার্চ করছে, মুভমেন্ট করছে। আমরা যদি অন্যায় করি, জনগণ আমাদের বিচার করবে। কিন্তু কোনো গুপ্ত ষড়যন্ত্র করে আপনারা সফল হবেন না।”

অন্যদিকে, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এসব অভিযোগকে স্রেফ রাজনৈতিক ট্যাগ আখ্যা দিয়ে বলেন, “এখন বিএনপিতে এমন কিছু মন্ত্রী আছেন, যাদের আমার ৪০ বছরের রাজনীতিতে কখনো মাঠে দেখিনি। তাহলে কি তাদেরও আমরা গুপ্ত মানব? এভাবী ভিত্তিহীন ট্যাগ দেওয়া খুব সহজ। আসলে সরকারের মূল দাবি হলো, জনগণের ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এবং এর আলোকে যে গণভোট হয়েছে, তার রায় বাস্তবায়ন করা। সেই মূল দাবি থেকে মানুষের মনোযোগ ভিন্ন খাতে সরাতেই সরকার এবং সরকারি দল বিএনপি এখন এসব গুপ্ত রাজনীতির ধুয়া তুলছে।”

সামগ্রিকভাবে, ‘গুপ্ত’ রাজনীতির এই বিতর্ক দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী দূরত্ব ও অবিশ্বাস তৈরি করছে। কে প্রকৃত দেশপ্রেমিক আর কে গুপ্তচর বা অনুপ্রবেশকারী এই প্রশ্নে বাংলাদেশের রাজনীতি এক নতুন ও জটিল সমীকরণের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিশ্বের বিভিন্ন কারাগারে ১৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি বন্দি

১

ইউরোপজুড়ে জেন জি বিক্ষোভ, উত্তাল রাজপথ

২

রাজবাড়ীতে সাত সকালেই সড়ক দুর্ঘটনায় মোটর সাইকেল চালক নিহত

৩

পণ্য জেতার আনন্দে কুয়াকাটা কার্নিভালে লিলি ও নিওরের স্টলে দর্শনার্থীদের ঢল

৪

গুলশান ইয়ুথ ক্লাব আয়োজিত ইন্টার ক্লাব স্পোর্টসফেস্টের প্রেস মিট অনুষ্ঠিত

৫

নতুন নম্বরপ্লেট ভুল নিয়মে বানালে হতে পারে শাস্তি

৬

নাগরপুরে যৌথ অভিযানে প্রায় ১১ লক্ষ টাকার অবৈধ কারেন্ট জাল জব্দ ও ধ্বংস

৭

চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত ২

৮

স্থগিত হলো প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার ১৫ প্রকল্পের অনুমোদন

৯

উদ্ধার করা ১ লাখ পিস ইয়াবা ‘গায়েব করে দিলেন’ তিনি!

১০

রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন, অপেক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের

১১

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিপীড়ন ‘দুঃখজনক ও লজ্জাজনক’: ধর্মমন্ত্রী

১২

টঙ্গীতে মাদ্রাসাছাত্রীর জবানবন্দি, কারাগারে উপাধ্যক্ষ

১৩

তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট’ পদ সৃষ্টির প্রস্তাব

১৪

যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের ৩ দিনের খাবার-পানি মজুতের নির্দেশনা

১৫

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি আসিফ মাহমুদের

১৬

সাজেক সড়কের অবরোধ নিরসনে আলোচনায় বসছে প্রশাসন

১৭

এইচএসসির ফল প্রকাশ ২৯ অক্টোবর

১৮

লাউ গাছের সঙ্গে এ কেমন শত্রুতা!

১৯

বিশ্ব আবহাওয়ায় যে পাঁচ প্রভাব ফেলেছে এল নিনো

২০