
দেশের ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা প্রমাণিত, ঝুঁকিতে মেধা ও বিকাশ নষ্ট হচ্ছে
বাংলাদেশের একটি বিশাল জাতীয় জরিপে দেখা গেছে যে দেশের ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার (হেপটাইটিস বি) এর স্তর বেশি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ জার্নালে প্রকাশিত প্রত্যক্ষ আলোচনায় স্পষ্ট করা হলো, নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের মধ্যে সিসারের উচ্চমাত্রার হার ৩০ দশমিক ২ শতাংশ ছিল, যেখানে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল। অর্থাৎ, আর্থসামাজিক অবস্থার মাপকাঠিতে পরিবার যত বেশি উচ্চ, তাদের শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতিযোচিত হওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি।
এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ হেলথ ইকোনমিকসের গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন এবং মো. ইমাম হাসান। তারা গত ১৪ অক্টোবরে প্রকাশিত মেডআর্কাইভ-এর অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত এই জরিপের উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন। সংশ্লিষ্ট গবেষণার ভিত্তিতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) থেকে প্রাপ্ত ১০ হাজার ৬২২ শিশুর রক্ত পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
জরিপের ফলাফল দেখে স্পষ্ট হবে যে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে গড়ে প্রায় ৩৯ জন (৩৮.৫%) রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসার রয়েছে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চমাত্রা হিসেবে স্বীকার করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (DWSS) মতে, শিশুদের রক্তে সিসারের যে কোনো নির্দিষ্ট নিরাপদ মাত্রা নেই, তাই এই স্তরের উপর গুরুতর পরীক্ষা এবং প্রশমণ্ধন অপরিহার্য।
গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন বলেছেন, ধনী পরিবারের শিশুদের প্যাকেটজাত খাবারের প্রবণতা বেশি থাকে। এছাড়া তাদের বাসায় আসবাব, দেয়ালের রং ও বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্রের ব্যবহার বেশি, যেগুলোতে সিসার উপস্থিতি থাকতে পারে। বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লার পরামর্শে বলা গেছে, বিশেষ করে আমদানি খেলনা এবং পোলট্রি মুরগির মাংসের চেষ্টম্যান হওয়া শিশুর শরীরে সিসার প্রবেশের প্রধান উৎস।
সিসার শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে বাধা দেয়। শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেছেন, সিসার মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত করতে পারে এবং অনুভূতি তৈরিকারক স্নায়ুর কার্যকারিতাকে নষ্ট করতে পারে। এর ফলে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা হ্রাস পায়, মনোযোগ ধরে রাখতে অসমস্য তৈরি হয় এবং আচরণগত পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ে।
জরিপের চিত্রগুলো জেনারেলভাবে দেখায় যে সিসার উপস্থিতিতে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ঢাকা শহরে শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা সবচেয়ে বেশি (৬৫.২%), এরপর সিলেট (৪৬.৭%) ও চট্টগ্রাম (৪২.১%) চলে রাজশাহীতে এর হার সবচেয়ে কম (১৫.৯%)।
বিশেষজ্ঞরা সমালোচনা করেছেন যে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। সিসার বিষক্রিয়া প্রতিরোধে কেবল চিকিৎসা নয়, বরং এর মূল উৎসগুলো শনাক্ত করে তা থেকে শিশুদের দূরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য করুন