৬ নভেম্বর ২০২৬, ৯:০৩ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

পৃথিবীতে কি সত্যিই পরী আছে? যা বলছে বিজ্ঞান

পৃথিবীতে পরীর অস্তিত্বের কোনো গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই

লোককথা, উপকথা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে পরী দীর্ঘদিন থেকে একটি রহস্যময় চরিত্র হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন দেশ ও সভ্যতায় তাদের উপস্থিতি বিভিন্ন রূপে চিত্রিত হয়েছে—কোনো কোনো কথায় তারা অপরূপ সুন্দরী নারী, আবার কোনো কোনো গল্পে ডানাযুক্ত ক্ষুদ্র মানবাকৃতি প্রাণী বা অদৃশ্য অতিপ্রাকৃত সত্তা। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে এখনও এই প্রশ্নটি কৌতূহলের বিষয় যে পৃথিবীতে সত্যিই পরী আছে কি না।

বিজ্ঞানীরা গভীর সমুদ্র থেকে দুর্গম পাহাড়, ঘন বন থেকে বরফে ঢাকা মেরু অঞ্চল까지 জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা করছেন। প্রতি বছর নতুন প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের সন্ধান मिल रही है। তবে রূপকথায় বর্ণিত পরীর মতো কোনো প্রাণীর অস্তিত্বের গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলে পর্যবেক্ষণযোগ্য ও যাচাইযোগ্য প্রমাণের প্রয়োজন হয়। শারীরিক নমুনা, জীবাশ্ম, জিনগত তথ্য, নির্ভরযোগ্য আলোকচিত্র বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যাওয়া পর্যবেক্ষণ এই প্রমাণের অংশ হতে পারে। পরীর ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পাওয়ায়নি। পৃথিবীর কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণা ডানাযুক্ত মানবাকৃতি অতিপ্রাকৃত প্রাণীর অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি।

জীববিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মতো শারীরিক গঠনবিশিষ্ট কোনো প্রাণীর পক্ষে শুধু পিঠে এক জোড়া ডানা থাকলেই উড়তে বেড়ানো সম্ভব নয়। উড্ডয়নের জন্য উপযুক্ত কঙ্কাল, শক্তিশালী পেশি, পর্যাপ্ত শক্তি উৎপাদন এবং বায়ুগতিবিদ্যার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শারীরিক গঠন প্রয়োজন। পাখি, বাদুড় ও পতঙ্গের উড্ডয়নক্ষমতা দীর্ঘ বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার ফল, কিন্তু রূপকথায় বর্ণিত মানুষের মতো দেহ ও ক্ষুদ্র ডানার সমন্বয় বাস্তব জগতে পর্যবেক্ষিত হয়নি।

ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি গবেষণায় দেখা যায়, পরীর ধারণা কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা সভ্যতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপীয় লোককথায় ‘ফেয়ারি’ বা ফেয়েরি চরিত্রের সঙ্গে প্রকৃতি, বন, পাহাড়, নদী ও জাদুবিদ্যার সম্পর্ক রয়েছে। পারস্যের সাহিত্য ও লোককথায় ‘পেরি’ বা পরী পরিচিত চরিত্র। পারসীয় সাংস্কৃতিক প্রভাবের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য ও কল্পকাহিনিতেও এই ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলা রূপকথায় পরী সাধারণত সৌন্দর্য, অলৌকিক ক্ষমতা ও রহস্যের প্রতীক। সব সংস্কৃতিতে তাদের চেহারা বা বৈশিষ্ট্য এক নয়; কোথায় তারা মানুষের মতো, কোথায় ক্ষুদ্রাকৃতি, আবার কোথায় দৃশ্যমান শরীরের বর্ণনাও নেই। তাই পরীকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন, তার সর্বজনস্বীকৃত কোনো সংজ্ঞা নেই।

আধুনিক চিত্রকলা, চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশনে পরীকে প্রায়ই স্বচ্ছ ডানা, উজ্জ্বল পোশাক ও জাদুর কাঠি সহ দেখানো হয়। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে তাদের সব সময় এইভাবে কল্পনা করা হয়নি। ইউরোপের অনেক পুরোনো লোককথায় পরীদের মানুষের মতো আকারের বা ভয়ঙ্কর রূপের সন্তাও বর্ণনা করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, পরীর চেহারা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা মূলত সাহিত্য, শিল্পকলা, লোকবিশ্বাস ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। বাস্তবে কোনো পরী শনাক্ত না হওয়ায় তাদের প্রকৃত চেহারা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক বর্ণনা দেওয়ার সুযোগ নেই।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অতীতে ও বর্তমানে কিছু মানুষ পরী বা রহস্যময় মানবসদৃশ সত্তা দেখার দাবি করেছেন। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা একই কোনো অতিপ্রাকৃত প্রাণীর অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়। মনোবিজ্ঞানী গবেষণায় দেখা যায়, মস্তিষ্ক প্রায় সময় অস্পষ্ট দৃশ্য, আলো-ছায়া বা অপরিচিত আকৃতি কে পরিচিত কোনো অবয়ব হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এই প্রবণতাকে ‘প্যারিডোলিয়া’ বলা হয়। ঘুম ও জাগরণের মধ্যবর্তী অবস্থায় কিছু মানুষ হ্যালুসিনেশন বা স্লিপ প্যারালাইসিসের অভিজ্ঞতা পেতে পারেন, যা অতিপ্রাকৃত ঘটনার সাথে মিশ্রিত হয়ে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। এর মানে এই নয় যে পরী দেখার প্রতিটি দাবির পেছনে একই কারণ কাজ করে; নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে হলে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হয়।

রূপকথায় পরীদের মানুষের সাথে কথা বলতে, বন্ধুত্ব করতে বা প্রেমে পড়তেও দেখানো হয়। কিছু গল্পে তারা মানুষের জগতে এসে বসবাস করে, আবার প্রয়োজন হলে অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনো প্রাণীর জীবনধারণের জন্য খাদ্য, শক্তি, বিপাকীয় কার্যক্রম ও প্রজননের মতো মৌলিক জৈবিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। পরীদের খাদ্য, বংশবিস্তার, আয়ু বা শারীরিক গঠন সম্পর্কে কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই। তাই তাদের মানুষের মতো জীবনযাপনের ধারণা এখন পর্যন্ত কল্পকাহিনি ও লোকবিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

বর্তমানে প্রায় সবার হাতে ক্যামেরাযুক্ত স্মার্টফোন রয়েছে। বনাঞ্চল পর্যবেক্ষণে স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা, বন্যপ্রাণী শনাক্তে আধুনিক প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট, ড্রোন ও উন্নত চিত্র বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হয়। এত প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পরেও পরীর অস্তিত্ব নিশ্চিত করার মতো গ্রহণযোগ্য নমুনা বা পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়নি। ইন্টারনেটে মাঝে মাঝে পরীর ছবি বা ভিডিও দাবি করে কন্টেন্ট ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু ছবি বা ভিডিও দেখেই সত্যতা নিশ্চিত করা যায় না। ডিজিটাল সম্পাদনা, কম্পিউটার-নির্মিত দৃশ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বাস্তবসম্মত কাল্পনিক দৃশ্য তৈরি করা সম্ভব। এই ধরণের দাবি যাচাই করতে মূল ভিডিও, ধারণের পরিস্থিতি, সম্পাদনার সম্ভাবনা ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

বিজ্ঞান সাধারণত প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। এখন পর্যন্ত পরীর অস্তিত্বের গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পাওয়ায়নি—এটি একটি বৈজ্ঞানিক অবস্থান। তবে প্রমাণ না পাওয়াটা এবং কোনো জিনিসের অস্তিত্ব চূড়ান্তভাবে অসম্ভব প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। গভীর সমুদ্র ও দুর্গম পরিবেশে অজানা জীবপ্রজাতি থাকতে পারে, কিন্তু নতুন প্রজাতি আবিষ্কারকে রূপকথার পরীর অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। কোনোদিন পরীর মতো অজানা প্রাণী আবিষ্কৃত হলে সেটিকেও অন্যান্য জীবের মতো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও শ্রেণিবিন্যাসের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপকথা ও লোককাহিনি মানুষের আশা, ভয়, আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করে। পরী কখনো সৌন্দর্যের প্রতীক, কখনো বিপদ থেকে উদ্ধারকারী, আবার কখনো সাধারণ ক্ষমতার বাইরের রহস্যময় শক্তির প্রতিনিধি। শিশুসাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র, নাটক থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—বিভিন্ন মাধ্যমে পরীর ধারণা নতুন রূপ পেয়েছে। বাস্তবে পরী থাকুক বা না থাকুক, মানুষের কল্পনাজগতে তাদের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী।

বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, পৃথিবীতে রূপকথায় বর্ণিত পরীর অস্তিত্ব এখন পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি। ডানা, জাদুকরী ক্ষমতা, অদৃশ্য হওয়ার সামর্থ্য বা মানুষের মতো জীবনযাপনের কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। সাহিত্য, লোককথা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরী একটি গুরুত্বপূর্ণ কল্পিত চরিত্র হিসেবে টিকে আছে। আপাতত বিজ্ঞানের উত্তর একটাই—পৃথিবীতে পরীর অস্তিত্বের কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নেই, যদিও মানুষের কল্পনায় পরীদের বিচরণ থেমে নেই।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কোনো খরচ ছাড়া মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাবে বোয়েসেল

১

ইরানে হামলার নতুন পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের

২

খাগড়াছড়িতে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ সিজন-২ এর প্রতিযোগিতা শুরু

৩

বাংলাদেশে সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশনের লক্ষ্যে ACROSS-BD স্টেকহোল্ডার সভা

৪

পুতিনের কাছে মোজতবা খামেনির বার্তা

৫

সোনারগাঁও হোটেলের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ

৬

মানবপাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গুলি বিনিময়, সেনাসদস্য আহত

৭

সামান্তার রাজনৈতিক জার্নি অনেক বাকি: তাসনিম জারা

৮

টেকনাফে মানব পাচারকারীদের গুলিতে আহত সেনাসদস্যের মৃত্যু: আইএসপিআর

৯

পৃথিবীতে কি সত্যিই পরী আছে? যা বলছে বিজ্ঞান

১০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি আবেদন শুরু ১১ নভেম্বর, পরীক্ষা ৫ ডিসেম্বর থেকে

১১

তাহসিফের মৃত্যু: তৃতীয় দফায় দীপের ৩ দিনের রিমান্ড

১২

এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন সামান্তা শারমিন

১৩

মনোহরদীতে দুই খামারির ৫ গরু চুরি, ক্ষয়ক্ষতি ১০ লাখ টাকার

১৪

এলএনজি বিদ্যুতে বাড়ছে ভর্তুকির চাপ, নতুন বিনিয়োগ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

১৫

৭ নভেম্বর পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা

১৬

ঈশ্বরদীতে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রীকে বিয়ের অভিযোগে শিক্ষক বরখাস্ত

১৭

শেরপুর ৭ নভেম্বর উপলক্ষে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত

১৮

উড়োজাহাজের জ্বালানির দাম লিটারে ৬ টাকা ৩২ পয়সা বাড়ল

১৯

ইউরোপজুড়ে একাধিক ফ্লাইটে আবার বোমা হামলার হুমকি

২০